একাডেমিক

জামিয়ার শিক্ষাসূচি ও বিভাগসমূহ

নূরানী মক্তব বিভাগ : এ বিভাগে ২ বছরের কোর্সে ছোট ছেলে-মেয়েদেরকে আরবী হরফ আলিফ-বা থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ সহীহ-শুদ্ধভাবে নাজেরা চালু করে পড়ার যোগ্যরূপে গড়ে তোলা হয়। সেই সাথে নামাযের যাবতীয় নিয়ম-কানুন, বিভিন্ন মাসনূন দোয়া ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় মাসাইল ৪০ হাদীসসহ শিক্ষা দেওয়া হয়। একই সাথে ২য় শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, অংক ও ইংরেজি গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয়।

হিফজুল কুরআন বিভাগ : যারা কুরআন শরীফ সহীহ-শুদ্ধভাবে নাজেরা চালু করে পড়তে পারে, এ বিভাগে তাদেরকে কুরআন শরীফ হিফজ (মুখস্থ) করানো হয়। বিগত ১১ বছর ধরে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ হাফেজ দ্বারা আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে এ বিভাগের কাজ পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর অত্র মাদরাসায় হিফজ সম্পন্নকারী ছাত্ররা বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড) এর কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে সুনাম অর্জন করছে।

কিতাব বিভাগ : যারা হাফেজ কিংবা অন্তত সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন শরীফ পড়া শেষ করেছে, এ বিভাগে তাদেরকে ১ম জামাত থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত তাফসীর, হাদীস, উসূলে হাদীস, ফিকাহ্ (ইসলামী আইন শাস্ত্র) উসূলে ফিকাহ্, আরবী সাহিত্য, ব্যাকরণ, আকাইদ, বালাগত (অলংকার শাস্ত্র) ও মানতেক (যুক্তিবিদ্যা) সহ যাবতীয় বিষয়ের কিতাবসমূহ শিক্ষাদানের মাধ্যমে যোগ্য আলেমে দ্বীন হিসাবে গড়ে তোলা হয়। উল্লেখ্য, এ বিভাগে ৩য় শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, অংক ও ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ইফতা বিভাগ : (ইসলামী আইন শাস্ত্রের উচ্চতর ডিগ্রি কোর্স) এ বিভাগে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্নকারী উপযুক্ত ও দাওরায়ে হাদীসে ভালো ফলাফল অর্জনকারী ছাত্রদের যোগ্য মুফতীদের তত্ত্বাবধানে ইসলামী আইন শাস্ত্রের সর্বোচ্চ কিতাবাদি পাঠদান করা হয় এবং এ বিভাগ থেকে মুসলিম জনগণের সমসাময়িক জিজ্ঞাসার ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক জবাব ও ফতোয়া প্রদান সহ ফারায়েয এর সমাধান লিখিতভাবে দেওয়া হয়।

কুতুবখানা বা লাইব্রেরি : এ বিভাগ থেকে জামিয়ার শিক্ষকবৃন্দ ও ছাত্রদেরকে যাবতীয় পাঠ্যপুস্তক ও তদসম্পর্কীয় অভিধান এবং ব্যাখ্যাগ্রন্থাদি কোনো বিনিময় গ্রহণ ছাড়াই সাময়িকভাবে ধার দেওয়া হয়। সময়ের বিচারে জামিয়া প্রতিষ্ঠার বয়স অতি কম হওয়ায় লাইব্রেরির প্রয়োজনীয় কিতাবের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনও হয়ে ওঠেনি। উপরন্তু দাওরায়ে হাদীস ও ইফতা বিভাগ চালু হওয়ায় ন্যূনতম ৫,০০,০০০/= (পাঁচ লক্ষ) টাকার কিতাব একান্ত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সদকায়ে জারিয়াস্বরূপ দানশীল ভাইদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।

প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ : এ বিভাগ থেকে বিভিন্ন সময়ে ইসলামের প্রয়োজনীয় বিষয়ের উপর পুস্তক-পুস্তিকা ছাপিয়ে বিতরণ করা হয়। আপনারা নিশ্চয়ই জেনে খুশি হবেন, ধারাবাহিকভাবে প্রথম দুই বছর জামিয়ার দাওরায়ে হাদীস ফারেগ ছাত্রদের উদ্যোগে ‘দারুল উলূম স্মারক’ নামে ২২৪ পৃষ্ঠার একটি স্মারকগ্রন্থ ও ‘ইসলাম কী; নামে ১৯২ পৃষ্ঠার অপর একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে। যা সুধীজনদের নিকট অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছে। পরবর্তী বছর ‘দারুল উলূম স্মারক’ হিসাবে প্রকাশিত ‘নামাযের মাসায়েল ও স্থায়ী সময়সূচি’ এর ব্যাপক চাহিদায় সুধীমহলের পরামর্শের ভিত্তিতে পুনরায় বর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণসহ আবারো প্রকাশ করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেয়ামতের পূর্বে উম্মতে মুসলিমার উপর পর্যায়ক্রমে আবির্ভূত বিভিন্নমুখী ফিৎনার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক করেছেন। ইরশাদ করেছেন, ‘বনী ইসরাঈল বাহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়েছে, আমার উম্মত তিহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হবে, তন্মধ্যে এক ফেরকা (আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ) ব্যতীত সকলের ঠিকানাই জাহান্নাম।’

মুসলিম উম্মাহর জন্য যুগে যুগে বিপদজনকভাবে আবির্ভূত হওয়া বাহাত্তর ফেরকা সম্পর্কে সজাগ ও সতর্ক করা নায়েবে রাসূল তথা উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক অর্পিত এই দায়িত্বের নিরিখেই গত তিন বছর আগের দাওরায়ে হাদীস ফারেগ ও ইফতা বিভাগের ছাত্ররা বর্তমান যমানার উম্মতে মুসলিমার জন্য বিপজ্জনক ফিৎনা গাইরে মুকাল্লিদীন তথা মাযহাববিরোধীদের স্বরূপ উন্মোচনে ‘মাযহাব বিরোধীদের উপহার’ নামে প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। আলহামদুলিল্লাহ! অতীতের সবক’টি স্মারক গ্রন্থের তুলনায় তা অনেক বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশেষত আলেম সমাজে তা বিপুল সমাদৃত হয়েছে। আর গত বছর ‘মুমিনের সকাল-সন্ধ্যা’ নামে একটি পকেট পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সেটাও দ্বীনদার মহলে সাড়া জাগিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ! বর্তমান শিক্ষাবর্ষ ১৪৩৮-৩৯ হি. মোতাবেক ২০১৭-১৮ ঈ. ৮ম স্মারক গ্রন্থ হিসেবে ‘রাসূলে আরাবী’ও পাঠক মহলে বিপুল সমাদৃত হবে বলে আমরা আশাবাদী।

লিখনীতে যোগ্য কলম সৈনিক তৈরির লক্ষ্যে ‘দারুল উলূম’ নামে ষান্মাসিক বাংলা আরবী দেয়ালিকা বের করা হচ্ছে। আগামীতে যুগোপযোগী ও সমসাময়িক বিষয়াবলির উপর ইসলামী দিকনির্দেশনা সম্বলিত তথ্যসমৃদ্ধ একটি মাসিক পত্রিকা বের করার একান্ত ইচ্ছা আমাদের রয়েছে।

দাওয়াত ও তাবলীগ বিভাগ : সাল লাগানো যোগ্য আলেম মুবাল্লিগের তত্ত্বাবধানে আসাতিযায়ে কেরাম ও ছাত্রদের তরতীব করে ২৪ ঘণ্টার জামাত এবং ছুটিতে ৩ দিনের জামাত ও চিল্লার জামাত পাঠানোর মাধ্যমে ঘরে ঘরে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রশিক্ষণ বিভাগ : এ বিভাগে ছাত্রদেরকে আরবী ও বাংলা ভাষায় বক্তৃতা প্রশিক্ষণ এবং শিরক-বিদআতসহ ‘ফিরাকে বাতেলাহ’ (ভ্রান্ত দল-উপদল) গুলোর মোকাবিলায় বক্তৃতা ও লিখনীর মাধ্যমে ‘মুনাযারা’ ও ‘মুবাহাছা’র (বিতর্ক) প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য মুনাযির (বাগ্মী) হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

পাঠাগার বিভাগ : ‘দারুল উলূম পাঠাগার’ নামে একটি আদর্শ পাঠাগার প্রতিষ্ঠার বাসনা আমাদের দীর্ঘদিনের। যেখানে বিখ্যাত লেখকদের ইসলামী জ্ঞানসমৃদ্ধ বই-পুস্তক ও মহা মনীষীদের জীবনী গ্রন্থাদি থাকবে। যা সাধারণ মানুষ ও ছাত্রদের অবসর সময়ে পাঠ করার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বর্তমানে ক্ষুদ্রাকারের এ পাঠাগারকে সমৃদ্ধ করতে দানশীল ভাইদের সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।

কম্পিউটার প্রশিক্ষণ বিভাগ : এ বিভাগে উপরের জামাতের ছাত্রদেরকে নিজস্ব কম্পিউটারে যুগচাহিদার নিরিখে ফ্রি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ফতোয়া বিভাগ : এ বিভাগে প্রখ্যাত ও যোগ্য মুফতী সাহেবদের দ্বারা ইসলামী বিষয়ের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর ও মাসআলা-মাসায়েলের শরয়ী সমাধান দেওয়া হয়।

বয়স্কশিক্ষা কার্যক্রম : কর্মব্যস্ত মানুষের দ্বীনী শিক্ষার বিষয়টি আমাদের নিকট অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে বর্তমানে প্রতিদিন এশার নামাযের পর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোগ্য শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েলসহ আরবী অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষার সম্পূর্ণ ফ্রি কার্যক্রম চলছে। অচিরেই তা আরও গতিশীল করা হবে ইনশাআল্লাহ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : মাদরাসার জরুরত পূরণে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে উস্তাদ ও ছাত্রদের সমন্বয়ে দৈনিক আসর নামাযের পর খতমে খাজেগান পাঠ করা হয়। এতে দানশীলগণের রোগ, বালা-মুছিবত দূর ও মৃত মুরুব্বী আত্মীয় স্বজনের রূহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষভাবে দোয়া করা হয়।